দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে ১,২০০ জন ইহুদিকে বাঁচিয়ে যে মানুষটি ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছেন,তিনি হচ্ছেন এই Oskar
Schindler। একজন নাৎসি বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধের সময় এত ইহুদিকে প্রাণে বাঁচিয়ে যে দৃষ্টান্ত তিনি দেখিয়েছেন,সেজন্যে তিনি তাদের অন্তরে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।
জেনে নেয়া যাক এই মানুষটি ও তাঁর কর্ম সম্পর্কেঃ-
প্রাথমিক জীবনঃ
Schindler ১৯০৮ সালের ২৮ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, মোরাভিয়া, জুইটাউউতে একটি সুডেটিন জার্মান পরিবারে। তাঁর পিতা ছিলেন Johann
“Hans” Schindler একটি খামার যন্ত্রপাতি ব্যবসার মালিক এবং তাঁর মা ছিলেন
Franziska “Fanny” Schindler (née Luser)।
১৯২৮ সালে বিয়ের পরেই Schindler তাঁর পিতার কাজ ছেড়ে চলে যান এবং একটি ড্রাইভিং স্কুলে মোরেভিয়ান ইলেক্ট্রটেকনিকের পদ গ্রহণ করেন। চেক সেনাবাহিনীর ১৮ মাসের কর্মজয়ের পর তিনি ৩১ তম তৎকালীন দশম পদাতিক রেজিমেন্টের ল্যান্স-কর্পোরাল পদে উন্নীত হন। পরে Schindler মোরেভিয়ান ইলেক্ট্রটেকনিকে আবার ফিরে আসেন,যা খুব শীঘ্রই দেউলিয়া হয়ে যায়। তাঁর বাবার খামার যন্ত্রপাতি ব্যবসা একই সময়ে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। Schindler কে একটি বছর জন্য বেকার রেখে তিনি ১৯৩১ সালে Jarslav Simek Bank of Prague এর চাকরি নেন, যেখানে তিনি ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কাজ করেন।
Schindler ১৯৩৫ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী সুডেটিন জার্মান পার্টিতে যোগদান করেন। যদিও তিনি চেকোস্লোভাকিয়ার নাগরিক ছিলেন। Schindler ১৯৩৬ সালে নাৎসি জার্মানি গোয়েন্দা সংস্থার Abwehr এর
গুপ্তচর হন। Abwehr এর কাজগুলির মাঝে অন্তর্ভুক্ত ছিল নাৎসি জার্মানির দ্বারা পরিকল্পিতআক্রমণের পূর্বে রেলপথ, সামরিক স্থাপনা এবং সৈন্যদলের আন্দোলন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা, পাশাপাশি চেকোস্লোভাকিয়াতে অন্যান্য গুপ্তচরদের নিয়োগ করা। ১৯৩৮ সালের ১৮ জুলাই গুপ্তচরবৃত্তির জন্য তাকে চেক সরকার কর্তৃক গ্রেফতার করা হয় এবং অবিলম্বে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে তিনি মিউনিখ চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী রাজনৈতিক বন্দি হিসাবে মুক্তি পান এবং যার প্রেক্ষিতে ১ জুলাই চেক প্রজাতন্ত্রের সাথে যুক্ত হয় সুইডিশ দ্বীপ । Schindler ১ নভেম্বর নাৎসি বাহিনীর সদস্যপদের জন্য আবেদন করেন এবং ওই বছরেই তা গৃহীত হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ
Emalia
নাৎসি বাহিনীর সদস্য এবং Abwehr-এর গোয়েন্দাসংস্থার সদস্য হিসেবে Schindler
গ্রেফতারের ঝুঁকিতে ছিলেন
Schindler ১৯৩৯ সালের অক্টোবরে Abwehr
এর ব্যবসার জন্য
Kraków গিয়ে একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনেন। পোলিশ ইহুদিদের সম্পত্তির মালিকরা তাদের সম্পত্তি, ব্যবসায়ের জায়গা বাড়ি সহ সম্পত্তি দখল করে অবিলম্বে আক্রমণ শুরু করে এবং ইহুদি নাগরিকরা তাদের নাগরিক অধিকার ছিন্ন করে।
Abraham Bankier এর মত কয়েকজন ইহুদি বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সহায়তায়
Schindler ১৯৩৯ সালের ১৩ নভেম্বর কারখানায় একটি অনানুষ্ঠানিক চুক্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং ১৫ জানুয়ারি, ১৯৪০ তারিখে ব্যবস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। তিনি এর নাম দেন “Deutsche
Emaillewaren-Fabrik” (German
Enamelware Factory) বা DEF এবং অল্পসময়েই তা “Emalia” নামে পরিচিতি পায়। প্রাথমিকভাবে Schindler ব্যবসাইয় অধিক মুনাফার জন্য আগ্রহী ছিলেন এবং ইহুদীদের ভাড়া করার কারণ ছিল তারা পোলসদের তুলনায় সস্তা ছিল। পরে তিনি কর্মীদের বাঁচাতে শুরু করেন মুল্যের জন্য।
Płaszów
১৯৪১ সালের দিকে নাৎসিরা ,ইহুদিদের Ghetto
থেকে বের করে দেয় এবং তাদের অধিকাংশকে Belzec extermination camp এ নিয়ে হত্যা করে। ১৩ মার্চ ,১৯৪৩ সালে Ghetto
থেকে ইহুদি নির্মুল করা হয় এবং যারা কাজ করতে সমর্থ তাদের Płaszów এর concentration camp এ পাঠানো হয়।
Schindler নাৎসির হত্যা পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত ছিল। তাই তিনি তার কর্মীদের কারখানায় থাকতে বললেন যাতে কারো কোনো ক্ষতি না হয়। তৎকালীন ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিল SS- Hauptsturmführer Amon
Göth। Schindler যাকে বলেছিলেন সবচেয়ে “নিষ্ঠুর ব্যক্তি”। কেননা Göth নির্বিশেষে সকল ইহুদিকে হত্যার এক নির্মম খেলায় মেতে উঠেছিল।
Schindler কে ১৯৪১ সালে কালোবাজারি সন্দেহে একবার এবং ১৯৪২ সালে তার জন্মদিনে এক ইহুদি মেয়েকে চুম্বনের জন্য দ্বিতীয়বারের মত গ্রেফতার করা হয়।
Göth কে ১৯৪৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য গ্রেফতার করা হয় এবং ঠিক ২ বছর পর ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।
Brünnlitz
গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুর হাত থেকে তার কর্মীদের বাঁচানোর জন্য
Schindler বার্লিনে Göth এবং তার সহকারীদের বোঝাতে সক্ষম হন এবং Sudetenland এর Brünnlitz
পাঠিয়ে দেন । Ghetto পুলিশ অফিসার Marcel Goldberg এর সহযোগিতায় তিনি ১২০০জন ইহুদির তালিকা বানান যাতে ১০০০ জন
Schindler এর কর্মী ও বাকি ২০০জন Julius Madritsch’s টেক্সটাইল ফ্যাক্টরির ছিল।
রেড আর্মি আসার সাথে সাথে
Schindler তার কর্মী হত্যার জন্য SS কর্মকর্তাদের আটক করেন।
১৯৪৫ সালের ৭ই মে
Schindler এর কর্মীরা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিলের রেডিও ভাষণ শোনার জন্য কারখানার মেঝেতে জড়ো হন। সেদিন চার্চিল ইউরোপে জার্মানির যুদ্ধশেষের ঘোষণা দেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর:
নাৎসি বাহিনীর সদস্য এবং Abwehr
এর গোয়েন্দাসংস্থার সদস্য হিসেবে
Schindler গ্রেফতারের ঝুঁকিতে ছিলেন। Bankier, Stern(তাঁর অ্যাকাউন্টেন্ট) এবং অন্যান্য অনেকে মিলে একটি বিবৃতি তৈরি করেছিলেন,যা তিনি ইহুদিদের জীবন রক্ষা করায় তাঁর ভূমিকার প্রমাণের জন্য আমেরিকানদের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। তাঁকে একটি রিং উপহার দেয়া হয়েছিল যেখানে লেখা ছিল “Whoever
saves one life saves the world entire.”
তাঁকে নিয়ে বানানো হয়েছে বিখ্যাত চলচ্চিত্র “Schindler List”
তিনি বেঁচে থাকবেন সেসব মানুষের মনে,যাদের তিনি বাঁচিয়েছিলেন এক নির্মম মৃত্যুর হাত থেকে।


0 মন্তব্যসমূহ