রিচার্ড থ্যালার: এক অনন্য নোবেল বিজয়ী


১৯৮৬ সালের দিকের কথা, অর্থনীতিবিদদের নীরস এক কনফারেন্সে দুই তরুণ অর্থনীতিবিদ একসাথে খেতে বসেছেন। একজন আরেকজনকে বললেন, “তুমি কি আমেরিকান ইকোনমিক এসোসিয়েশনের নতুন জার্নালের কথা শুনেছ?”
-“কোন জার্নাল?”
-“জার্নাল অফ ইকোনমিক পারস্পেক্টিভস। এই জার্নালটি মূলত কিছুটা সহজ ভাষায় অর্থনীতি বিষয়ক প্রবন্ধকে প্রাধান্য দেবে। এই লেখাগুলো ঠিক সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ্য করে লেখা হবে না। তবে জার্নালটির মূল পাঠকগোষ্ঠী হচ্ছে অর্থনীতির শিক্ষার্থীরা।
-“বাহ্‌, এটা তো দারুণ ব্যাপার! আমি তো এখানে চাইলেই নিয়মিত মানুষের আচরণের বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে কলাম লিখতে পারি!”
ওপরের কথোপকথনের প্রথম জন হচ্ছেন হ্যাল ভ্যারিয়ান, দ্বিতীয়জন হচ্ছেন রিচার্ড থ্যালার। ভ্যারিয়ান বর্তমানে গুগলের চিফ ইকোনমিস্ট এবং ইউসি বারকলের ইমিরেটাস অধ্যাপক। সারা বিশ্বে তাঁর লেখা অর্থনীতির বই বহু মানুষ পড়েছে এবং তা ২২টি ভাষায় অনূদিতও হয়েছে।
রিচার্ড থ্যালার হচ্ছেন ২০১৭ তে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ। থ্যালার বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগোর বুথ স্কুল অফ বিজনেসে অর্থনীতি শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। আজকের লেখার মূল বিষয় তাঁর জীবন এবং তাঁর কাজ। এখন আমরা ফিরে আসি সেই কলামের ব্যাপারে। পরবর্তীতে Anomaly(অসংগতি) শিরোনামে রিচার্ড থ্যালার নিয়মিত জার্নালটিতে লিখতে শুরু করেন। থ্যালারের এই কলামের মূল উদ্দেশ্য ছিল এটা তুলে ধরা যে অর্থনীতির মূল ভিত্তি একটি ভুলের ওপর দাঁড় করানো। অর্থনীতির সকল তত্ত্বকথার মূলে রয়েছে যে মানুষ যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়।
থ্যালার দেখাতে চাইলেন যে মানুষ আসলে প্রকৃতপক্ষে যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয় না। তাদের যৌক্তিক চিন্তাভাবনার মাঝে সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। এই উদ্দেশ্য নিয়ে চার বছর ধরে তিন মাস পর পর তিনি ভিন্ন ভিন্ন অসংগতি নিয়ে লিখতেন।
থ্যালার জানতেন যে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে অসংগতি রয়েছে, তা প্রমাণের একমাত্র উপায় হচ্ছে, অসংগতির একটা লম্বা তালিকা তৈরি করা। কারণ, একটি অথবা দুইটি অসংগতি খুব সহজেই বিভিন্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে বাতিল করে দেয়া সম্ভব।
কিন্তু যখন অসংগতির অনেক নিদর্শন দেখানো সম্ভব হবে, তখন সেগুলোর জন্য ব্যাখ্যা দাঁড় করানো কঠিন হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে অসংগতি একটি গ্রহণযোগ্য ধারণা হিসেবে গড়ে উঠবে। ফলে, এটিও প্রমাণিত হবে যে মানুষ সবসময় যৌক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয় না।
এজন্য থ্যালার একে একে ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন অসংগতি নিয়ে ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন কলাম লেখেন এবং আস্তে আস্তে কিছু মানুষের ধারণার পরিবর্তন হতে থাকে। থ্যালার মনে করেন যে ১৯৮৭ সালের যুক্তরাষ্ট্রেরশেয়ার মার্কেট ধ্বস মানুষের মনোভাব পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।
এরকম উদ্ভট কাজের এক লম্বা তালিকা থ্যালারের ব্ল্যাকবোর্ডে ছিল
চারপাশের অসংগতি নিয়ে থ্যালার বহু আগে থেকেই কাজ শুরু করেন।৮০- দশকে যখন তিনি কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন, তখন থেকেই মানুষের আজবকর্মকাণ্ডের একটি তালিকা রাখতেন।
এরকম একটি উদ্ভট কাজের উদাহরণ হচ্ছে যে মানুষ কেন একটি রেস্তোরাঁয় আর কখনো ফেরত যাবে না, সেটি জানার পরেও ওয়েটারকে টিপস দেয়। অর্থনীতির তত্ত্বমতে মানুষ সবসময় নিজের লাভ বাড়াতে চায়। তাই, এমতাবস্থায় মানুষের আর টিপস দেয়ার কোন কারণ নেই।
টিপস দিলে রেস্তোরাঁর ওয়েটার খুশি থাকবে এবং পরবর্তীতে ভালোভাবে সেবা দিবে। কিন্তু যখন একজন ক্রেতা জানেন যে তিনি আর ফেরত যাবেন না, তখন টিপস দেয়ার আর কোন কারণ থাকে না এরপরও বহু মানুষ এরকম পরিস্থিতিতে টিপস দেন বলে থ্যালার দেখতে পান।
এরকম উদ্ভট কাজের এক লম্বা তালিকা থ্যালারের ব্ল্যাকবোর্ডে ছিল। এই তালিকাই থ্যালারের বিহেভরিয়াল ইকোনমিক্স নিয়ে কাজ করার প্রথম ধাপ ছিল।
বিহেভরিয়াল ইকোনমিক্স মূলত অর্থনীতির সাথে মনোবিজ্ঞানের মেলবন্ধন সৃষ্টিকারী একটি বিষয়। মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্ব কীভাবে অর্থনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কাজে আসতে পারে, সেটি নিয়ে থ্যালার কাজ করেছেন। এই বিষয়ে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্যই ২০১৭ সালে তিনি নোবেল লাভ করেন।
থ্যালার দেখিয়েছেন যে মানুষের যৌক্তিকতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি এটিও দেখিয়েছেন যে মানুষের আত্ননিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে। তিনি অর্থনীতির বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলিকে বিবেচনা করার কথা বলেছেন। তিনি এক্ষেত্রে “Nudge” ব্যবহারের কথা বলেছেন।
Nudge”এমন একটি পদ্ধতি যেখানে ব্যক্তিকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রণোদনা দেয়া হয়। ফলে, ব্যক্তি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে অনুপ্রাণিত হয়। এক্ষেত্রে কাউকে বাধ্য করা হয় না। থ্যালার দেখিয়েছেন যে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা রয়েছে, বাধ্য না করে প্রণোদনা দিলেই বরং মানুষের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
থ্যালার এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রায় চার দশক ধরে গবেষণা করছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য দুইটি বই হচ্ছেঃ Nudge: Improving Decisions on Health, Wealth, and Happiness এবং  Misbehaving: The Making of Behavioral Economics উনার তত্ত্বকে ব্যবহার করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের মত দেশে আলাদা দপ্তর রয়েছে। তিনি নিজেও যুক্তরাজ্য সরকারের সাথে এই বিষয়ে পাঁচ বছর কাজ করেছেন। রিচার্ড থ্যালার অর্থনীতির জগতকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দিয়েছেন এবং তাঁর কর্মকাণ্ডের ফলাফল ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। তিনি নিজেও তাঁর দেয়া যৌক্তিকতার সীমাবদ্ধতা তত্ত্বের বাইরে নন, এটি প্রমাণ করতেই বোধহয় নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন যে নোবেল পুরষ্কারের টাকা যথাসম্ভব অযৌক্তিকভাবে খরচ করবেন!
ভবিষ্যতে বিহেভারিয়াল ইকোনমিক্স-এর আলোচনায় আর কী কী পরিবর্তন নিয়ে আসে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন! সেই পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে রিচার্ড থ্যালার যে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ